টেকসই গণতন্ত্র একটি দেশের অবাধ, অংশগ্রহণমূলক, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ জাতীয় নির্বাচনের ওপর নির্ভর করে। আর নিশ্চিতভাবেই এই জাতীয় নির্বাচন একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। বাংলাদেশের মতো অনগ্রসর ও দুর্বল অবকাঠামোর দেশে জাতীয় নির্বাচন সন্দেহাতীতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ও সংবেদনশীল একটি বিষয়।
মনে রাখা প্রয়োজন জাতীয় নির্বাচন কেবলই ভোট দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটা দীর্ঘ, সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া। রাজনৈতিক নেতা, কর্মী, সমর্থক ও ভোটারদের পাশাপাশি একটি নির্বাচনে বিভিন্ন পেশাজীবী যুক্ত থাকেন। যারা অনেক ঝুঁকি মাথায় নিয়ে নির্বাচনের আগে-পরে এবং ভোটের দিনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
এইসব পেশাজীবীদের জন্য সাংবাদিক অন্যতম। যারা নির্বাচনের দিনে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে ভোটকেন্দ্রে নজর রাখেন। ভোটের দিন সাংবাদিকদের জন্য এই ঝুঁকি মোটা দাগে দুই ধরনের হয়।
এক. শারীরিক নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি
ও দুই. আধুনিক প্রযুক্তিজনিত ঝুঁকি।
২০২৪-এর অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতি এখনো একটি সন্ধিক্ষণে রয়েছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে শত্রুতাপূর্ণ মেরুকৃত অত্যন্ত স্পষ্ট। রাজনৈতিক পরিবেশও অত্যন্ত সংঘাতমুখর, অনেকক্ষেত্রে অগ্নিগর্ভ। এছাড়া বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে অতীতের রক্তাক্ত সংঘাত, প্রাণহানি, ভিন্নমত দমন, কালো টাকার দৌরাত্ম্য, সংবাদ মাধ্যম ও সাংবাদিক নিয়ন্ত্রণের অশুভ চর্চা এমনকি সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের ওপর আক্রমণের ঘটনাও দেখা গেছে।
বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি যত প্রতিযোগিতামূলক এবং সংঘাতপূর্ণ হয়, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি তত প্রবল নয়। সেই বিবেচনায় ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে সাংবাদিকদের ব্যাপকভাবে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পতিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। সাংবাদিকরা এরইমধ্যেই নির্বাচনের দিনে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে হাই রিস্ক, লো প্রিপেয়ার্ডনেস-জার্নালিস্ট সেফটি ইন ২০২৬ ইলেকশনশিরোনামের একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ডিজিটালি রাইট নামের একটি অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশের ১৯টি জেলার ২০১ জন সাংবাদিকের ওপর মতামতের পাশাপাশি ১০টি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল যাতে প্রায় ৯০ শতাংশ সাংবাদিক আসন্ন নির্বাচনে শারীরিক আক্রমণের শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। এই গবেষণায় সাংবাদিকরা রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোও নির্বাচনের দিনে কাজের ক্ষেত্রে সম্ভব্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
এছাড়া প্রায় ৫০ শতাংশ সাংবাদিক মনে করেন নির্বাচন সামনে রেখে তাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে। এরমধ্যে রয়েছে সাংবাদিকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হ্যাকিং, অপতথ্য ও ঘৃণা ছড়ানোর মাধ্যমে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি করা।
প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার নাজুক পরিস্থিতি বুঝতে গবেষণার প্রয়োজন হয় না। আমরা দেখেছি একদল মানুষ কীভাবে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে হাজার হাজার মানুষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে দুটি সংবাদপত্র অফিস জ্বালিয়ে দিতে পারে।
দ্য ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক মাহফুজ আনাম স্পষ্ট করে বলেছেন, বাংলাদেশে সাংবাদিকতা সর্বগ্রাসী আতঙ্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
সর্বগ্রাসী আতঙ্কের পরিবেশের মধ্যে নির্বাচনের দিনে বহুমুখী ঝুঁকি মোকাবিলায় সাংবাদিকের করণীয় কী?
পরিস্থিতি যতই সংঘাতমুখর হোক না কেন একজন সাংবাদিক বা সংবাদ সংশ্লিষ্ট কর্মী তো আর ঘরে বসে থাকতে পারবেন না। তাদের মাঠে থাকতেই হবে এমনকি প্রথম সাড়াদানকারী হিসেবে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় যেতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা খুব জরুরি।
নীরব এলাকা, সংবাদ ও জীবনের মূল্য-
জাতীয় নির্বাচন, রাজনৈতিক সংঘাত, সংঘর্ষ ও যুদ্ধ ক্ষেত্রে বিভিন্ন পক্ষ নিজ নিজ স্বার্থে এক ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করে থাকেন। যে বিষয়টি জাতিসংঘের শিল্প ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ সংক্রান্ত সংস্থা ইউনেস্কো উল্লেখ করেছে নীরব এলাকা বা হিসেবে।
রাজনৈতিক নেতা, কর্মী, সমর্থক ও ভোটারদের পাশাপাশি একটি নির্বাচনে বিভিন্ন পেশাজীবী যুক্ত থাকেন। যারা অনেক ঝুঁকি মাথায় নিয়ে নির্বাচনের আগে-পরে এবং ভোটের দিনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এইসব পেশাজীবীদের জন্য সাংবাদিক অন্যতম।সাধারণত এই নীরব এলাকা সৃষ্টি করা হয় আধিপত্য বজায় রাখতে, নির্বাচনের দিন ভোট কারচুপি করতে। যা বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে খুবই সঙ্গতিপূর্ণ।
সাংবাদিকের দায়িত্ব সংবেদনশীল সময়ে সেই নীরব এলাকায় প্রবেশ করা এবং যথাযথ সত্য মানুষের সামনে তুল ধরা। কিন্তু এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, মৃত্যু ঝুঁকি নেওয়া কোনো অবস্থাতেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। হ্যাঁ, সংবাদ অবশ্যই জরুরি।
সংবাদ সংগ্রহ এবং দ্রুত তা পাঠক-শ্রোতা-দর্শকের সামনে তুলে ধরা সাংবাদিকের দায়িত্ব। কিন্তু এক্ষেত্রে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে পতিত হওয়া, নিজের জীবন বিপন্ন করার কোনো সুযোগ নেই। এটা আত্মঘাতী চিন্তা। একজন সংবাদ কর্মীকে অবশ্যই নিজের জীবনের ঝুঁকি নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
এক্ষেত্রে সাংবাদিকদের আরও একটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু বাংলাদেশ নয় সারাবিশ্বে বিভিন্ন ধরনের সংঘাতে নিহত সাংবাদিকরা বিচার পর্যন্ত পান না। এ বিষয়ে একটি ভীতিকর তথ্য তুলে ধরা হয়েছে ইউনেস্কোর ইলেকশন অ্যান্ড মিডিয়া ইন ডিজিটাল টাইমস শিরোনামের প্রকাশনায়।
সেখানে নির্বাচনে সাংবাদিকের নিরাপত্তা সংক্রান্ত এক অধ্যায়ে বলা হয়েছে, ২০০৬ থেকে ২০১৮ সালে ১১০৯ জন সাংবাদিক হত্যার মধ্যে ১২ শতাংশ অর্থাৎ ১৩১টি মামলায় বিচারিক প্রক্রিয়ায় গিয়েছে। যার মধ্যে এক বা একাধিক অপরাধীর দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। এর অর্থ হলে এ রকম দিনে সংগঠিত অপরাধের জন্য দুষ্কৃতিকারীরা সাধারণত ছাড় পেয়ে যান। যা দিন শেষে একজন সংবাদকর্মীর নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করে।
নিরাপত্তা নির্দেশিকা জরুরি-
নির্বাচনের দিন সাংবাদিকদের নিরাপত্তায় ইউনেস্কো যে কয়েকটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নিরাপত্তা নির্দেশনা। ইউনেস্কোর ভাষায় সাংবাদিকরা হলেন সত্যের উপাসক, সত্য বলা তাদের দায়িত্ব। এই সত্য বলা বা সত্য প্রকাশই নির্বাচন দিনে চাপিয়ে রাখতে চায় কোনো কোনো গোষ্ঠী।
তাই তাদের সম্পর্কে জানা এবং তাঁদের তরফ থেকে আসা ঝুঁকিগুলো বিবেচনায় নিয়ে একজন সাংবাদিকের নিজস্ব নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি করা খুবই জরুরি। এক্ষেত্রে সেই সংবাদপত্র, টেলিভিশন বা অন্য মাধ্যমের গণমাধ্যম অফিসেরও দায়িত্ব রয়েছে। তারা অবশ্যই একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রাখবেন।
কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টও (সিপিজে) নির্বাচন দিনের মৌলিক প্রস্তুতির মধ্যে ঝুঁকি নিরূপণের বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেছে। এছাড়া সংবাদকর্মী ও তার সহযোগীদের নিরাপত্তার জন্য একটি বার্তাকক্ষের অবশ্যই আপদকালীন পরিকল্পনা থাকতেহবে। যে বিষয়ে একজন সংবাদকর্মীর দাফতরিক প্রশিক্ষণও প্রয়োজন।
কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টের বিস্তারিত নির্দেশনা-
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে কাজ করা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সিপিজে ২০২২ সালে নির্বাচন কাভারে সাংবাদিকের নিরাপত্তায় কী কী করণীয় সেসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা সুপারিশমালা তুলে ধরেছে।
নির্বাচনের দিন সাংবাদিকদের নিরাপত্তায় ইউনেস্কো যে কয়েকটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নিরাপত্তা নির্দেশনা।
আলোচনায় বার্তাকক্ষের প্রধান হিসেবে সাংবাদিকদের নিরাপত্তায় কী কী করণীয় সেসব বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। সেখান কয়েকটি বিষয় ছোট পরিসরে হলেও আলোচনার দাবি রাখে। বার্তাকক্ষের প্রধান বা প্রধান সম্পাদকের দৃষ্টিতে করণীয়গুলো অনেকটা নিম্নরূপ:
১। নির্বাচন কাভারের জন্য নিয়োজিত সংবাদকর্মীরা কি এই কাজের জন্য যথেষ্ট অভিজ্ঞ?
২। সাংবাদিকদের স্বাস্থ্যগত সমস্যা নিয়ে কি আপনি আলোচনা করেছেন যা কাজের সময় তাদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে?
৩। নির্বাচনের দিন সব কর্মীর জরুরি যোগাযোগের তথ্য রেকর্ড এবং সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষণ।
৪। দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের প্রেস পাস অথবা আপনার প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করার পরিচয় পত্র নিশ্চিত করা।
৫। খবর সংগ্রহে ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনা করা।
৬। দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংবাদিকের লিঙ্গ, জাতিগত পরিচয়, যৌন অভিমুখিতা অথবা প্রোফাইল কি আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে কী না?—সেই বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া।
৭। সাংবাদিকের নিরাপত্তা বর্ম (Body armor) ও অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে সতর্ক থাকা এবং সেগুলো সরবরাহ করা।
৮। নির্বাচনের দিন বার্তাকক্ষ তার দলের সাথে কীভাবে যোগাযোগ করবে এবং প্রয়োজনে তারা কীভাবে পরিস্থিতি থেকে নিজেদের সরিয়ে নেবেন?—ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে অথবা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে কর্মীদের সাথে কীভাবে যোগাযোগ করবেন সে বিষয়ে আগে থেকেই পরিকল্পনা করা।
৯। নির্বাচনের দিন সাংবাদিকরা গ্রেপ্তার বা আটক হলে কী করণীয় তা আগেই নির্ধারণ করে রাখা।
শেষ কথায় উল্লেখ করা প্রয়োজন, সংঘাতমুখর নির্বাচন ও প্রাণহানি কারও প্রত্যাশা নয়। নির্বাচনে সাংবাদিকরা নিরাপদে দায়িত্ব পালন করুন, একইসাথে পুরো নির্বাচন সংঘাতমুক্ত, প্রাণহানি মুক্ত থাকুক এই প্রত্যাশা সবসময়।
অনলাইন ডেক্স 



















